ছাত্রলীগকর্মী বাবুর আত্মহত্যা: রাজনৈতিক হতাশা নাকি পারিবারিক দুশ্চিন্তা

এসএম বাচ্চু, তালা : মানসিক দুশ্চিন্তা ও ছাত্ররাজনীতে হতাশাগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের ছাত্রলীগ কর্মী শেখ রিয়াদ হোসেন বাবু। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা করায় উপজেলা জুড়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা।
ফেসবুকে পোস্টর কারন ছাত্রলীগের পদ না পাওয়া নাকি পারিবারিক অশান্তিতে হতাশাগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে বাবু? এ প্রশ্ন ঘুরেফেরে নেতাকর্মীদের মাঝে।
তবে পরিবারের দাবি,ছাত্রলীগের পদ না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছে বাবু। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টেও তেমনই ইঙ্গিত দিয়ে যায় বাবু। উল্লেখ করেছে তার পরিবার নিয়ে হতাশার কথাও।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু একটি কারণ নয় বেশ কয়েকটি কারণে মানসিকভাবে অশান্তিতে ছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী শেখ রিয়াদ হোসেন বাবু। প্রায় তিন বছর আগে মায়ের মৃত্যুর পর বাবার নতুন বিয়ে।এরপর সৎ মায়ের সঙ্গে বিরোধ, সম্প্রতি পারিবারিক অশান্তির কারনে বাবুকে দায়ী করে মারপিট।এ ছাড়া রাজনীতিতেও ভালো অবস্থান তৈরী করতে না পারা, সম্পর্কের বিচ্ছেদ নিয়েও কষ্ট ছিল বাবুর মনে।
সরেজমিনে তালার খলিলনগর ইউনিয়নের হরিশচন্দ্রকাটি গ্রামের বাড়িতে গেলে বাবুর বাবা শেখ মনজুর রহমান বলেন, ‘ছাত্রলীগ করার জন্য বিভিন্ন সময় তার কাছ থেকে টাকা নিতো বাবু। সব টাকা দলের পেছনে খরচ করতো। তবে কোনো পদ না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আত্মহত্যার আগে তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবু এসব লিখে গেছে। আমি চাই বাংলাদেশে যেন এমন ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
রিয়াদ হোসেন বাবুর চাচী বলেন, ‘বিষ খেয়েছে রাজনীতির জন্য। এ ছাড়া কোনো কারণ আছে বলে জানা নেই। সপ্তাহ খানেক আগে বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে কয়েকদিন বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল পরে আবার ফিরে আসে। চলতে থাকে পারিবারিক অশান্তি। তিন বছর আগে মা মারা গেছে। এরপর দেড় বছর আগে বাবুর বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। রাজনীতি করতে গিয়েই হতাশ হয়ে বিষ খেয়েছে যা মৃত্যুর আগে তার ফেসবুকে লিখে গেছে।’
শেখ রিয়াদ বাবু ঘনিষ্টভাবে মিশতেন তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি মিলন রায়ের সঙ্গে। তবে গত তিন মাস খুববেশী যোগাযোগ ছিল না তাদের।
মিলন রায় বলেন, বাবু প্রথম দিকে তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মশিয়ার রহমানের সঙ্গে রাজনীতি করতো। তারপর আমার সঙ্গে মিশে রাজনীতি করতো। মা মারা গেছে, পারিবারিক সমস্যার সঙ্গে অর্থনৈতিক সমস্যাও ছিল।আমিও বিভিন্ন সময় তাকে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছি। তবে গত তিন মাস আমার সঙ্গে খুববেশী যোগাযোগ ছিল না।তিনি বলেন, ‘ঘুমের ওষুধ যদি খায় তবে সেটি মানসিক অশান্তির কারণে খেতো। রাজনীতি করে ভালোকিছু করতেও পারছে না আবার পারিবারিক টানাপোড়েন। ফ্যামিলি ও রাজনৈতিক দুই সমস্যায় ডিপ্রেশনে কি করবে?
আত্মহত্যা করা ছাত্রলীগ কর্মী শেখ রিয়াদ বাবু খুলনা বিএল কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠণিক সম্পাদক ছিলেন। বিএল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিব মোড়ল বলেন, বিএল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের সময় শেখ রিয়াদ বাবুর নামটি দেন খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেল। মৃত্যুর পর কমিটিতে দেখেছি তার নামটি রয়েছে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে।
তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ সাদী জানান, বাবুর মৃত্যুতে তালা উপজেলা ছাত্রলীগ গভীরভাবে শোকাহত। মৃত্যুর পর বাবুর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে প্রচার করা হচ্ছে শেখ রিয়াদ হোসেন বাবু খলিলনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের পদের প্রার্থী ছিলেন। দেড় বছর আগে খলিলনগর ইউনিয়ন কমিটি করা হয়। তখন কিন্তু এ বিষয়টি কেউই কখনো বলেনি বা সে নিজেও ঘোষণা দেয়নি। তার স্বপক্ষের কোনো প্রমাণও নেই। তাছাড়া তালা উপজেলা ছাত্রলীগের কোন শাখারই সে প্রার্থী ছিল না।তবে আত্মহত্যার পেছনের কারণ হিসেবে এই ছাত্রলীগ নেতা বলেন, পারিবারিক টানাপোড়েন। সব মিলিয়ে হতাশায় মানুসিক ভারসাম্য হারিয়ে আত্মহত্যার মতো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আমি মনে করছি। এখানে দলীয় পদ না পেয়ে মারা গেছে সেটি সঠিক নয়।এক শ্রেণির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বাবুর মৃত্যুর ঘটনাটিকে পুজি করে ছাত্রলীগের সুনাম ক্ষুন্ন করতে লাশ নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
খলিলনগর ইউনিয়নের ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি জামিরুল ইসলাম বলেন, পারিবারিক সমস্যার কারণে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। মশিয়ার রহমান কমিটি হারানোর পর রাজনীতিতে খুব বেশী সক্রিয় ছিল না।
এদিকে, বাবুর আত্মহত্যার ঘটনা শুনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ছুটে আসেন তার বাড়িতে। শান্তনা দেন পরিবারকে। ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা টিম পজেটিভ বাংলাদেশের মুখপাত্র গোলাম রাব্বানী বলেন, টাকার জন্য পদ না পেয়ে একজন ছাত্রলীগকর্মী আত্মহত্যা করবে এটি হতে পারে না।
তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ নুরুল ইসলাম জানান, ছাত্রলীগ একটি বড় সংগঠন। এখানে পদ না পেয়ে একজন আত্মহত্যা করবে কেন? যেহেতু অনেক কথা হচ্ছে ছাত্রলীগকে নিয়ে তাই এ ব্যাপারে যাচাই বাছাই বা পর্যালোচনা না করে এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
তবে সবকিছু বিশ্লেষণ করে এই বিষয়ে উপনীত হওয়া যায় যে, ছাত্রলীগ কর্মী বাবুর আত্মহত্যা অনাকাঙ্খিত ঘটনা। সে রাজনৈতিক কারন সহ পারিবারিক সমস্যায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেই ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *